... এক ওপর আরেক মুসলমানের ৬টি হক | সহিহ হাদিস

এক ওপর আরেক মুসলমানের ৬টি হক | সহিহ হাদিস




ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি অন্য মানুষের অধিকার আদায় করতে শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে একজন মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ হক বা অধিকার রয়েছে, যা আদায় করা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হকের কথা বলেছেন। এই হকগুলো আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে সুন্দর করে এবং সমাজে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।

এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ৬টি হক

সহিহ মুসলিমের ২১৬২ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, একজন মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে।

সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন—

১. সালাম দিলে তার উত্তর দেওয়া।

২. দাওয়াত দিলে তা কবুল করা।

৩. পরামর্শ চাইলে কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়া।

৪. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে তার জবাব দেওয়া।

৫. অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া।

৬. ইন্তেকাল করলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করা।

(সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৬২)

এবার প্রতিটি হক সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. সালামের উত্তর দেওয়া

এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে সালাম দিলে তার উত্তর দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদব এবং অধিকার। সালাম মুসলমানদের মধ্যে শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৮৬)

তাই আমাদের উচিত, কেউ সালাম দিলে অবহেলা না করে সুন্দরভাবে সালামের উত্তর দেওয়া।

২. দাওয়াত কবুল করা

কোনো মুসলমান আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ হক। দাওয়াত কবুলের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

তবে দাওয়াতে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ থাকলে কিংবা গ্রহণ করার বাস্তব অসুবিধা থাকলে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা এবং সম্পর্ক বজায় রাখা।

৩. পরামর্শ চাইলে কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়া

কোনো মুসলমান আপনার কাছে পরামর্শ চাইলে তার কল্যাণের কথা চিন্তা করে সঠিক ও আন্তরিক পরামর্শ দেওয়া উচিত।

নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য ভুল পরামর্শ দেওয়া, প্রতারণা করা কিংবা জেনেশুনে ক্ষতির দিকে পরিচালিত করা অনুচিত। বরং যে বিষয়ে জ্ঞান রয়েছে, সে বিষয়ে সৎভাবে পরামর্শ দিতে হবে। আর কোনো বিষয়ে জানা না থাকলে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়াই উত্তম।

৪. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে জবাব দেওয়া

ইসলামে হাঁচির পরও সুন্দর আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোনো মুসলমান হাঁচি দিয়ে “আলহামদুলিল্লাহ” বললে তার জবাবে “ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলা হয়।

এর অর্থ, “আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।”

এরপর হাঁচিদাতা বলেন, “ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম।” অর্থাৎ, “আল্লাহ আপনাদের হিদায়াত দিন এবং আপনাদের অবস্থা সংশোধন করে দিন।”

এভাবে ছোট একটি আমলের মাধ্যমেও মুসলমানদের মধ্যে দোয়া ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

৫. অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যাওয়া

কোনো মুসলমান অসুস্থ হলে তার খোঁজখবর নেওয়া, তাকে দেখতে যাওয়া এবং সুস্থতার জন্য দোয়া করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তার সঙ্গে কোমল আচরণ করা উচিত। তার কষ্ট বাড়ে এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। সম্ভব হলে তার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে।

এতে অসুস্থ ব্যক্তি মানসিক সান্ত্বনা পান এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।

৬. মুসলমানের জানাজায় অংশগ্রহণ করা

কোনো মুসলমান ইন্তেকাল করলে তার জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করা এবং সম্ভব হলে দাফন পর্যন্ত সহযোগিতা করা মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

জানাজার নামাজ মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার একটি বিশেষ সুযোগ। এর মাধ্যমে আমরা মৃত্যুর কথা স্মরণ করি এবং আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের শিক্ষা পাই।

রাসুলুল্লাহ ﷺ জানাজার নামাজ ও দাফন পর্যন্ত অংশগ্রহণের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে উৎসাহ দিয়েছেন। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী মৃত মুসলমানের জানাজায় অংশ নেওয়া উচিত।

মুসলমানের হক আদায় করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একজন প্রকৃত মুসলমান শুধু নিজের ইবাদত নিয়েই ব্যস্ত থাকেন না; তিনি অন্যের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন থাকেন। সালামের উত্তর দেওয়া, অসুস্থের পাশে দাঁড়ানো, সৎ পরামর্শ দেওয়া কিংবা জানাজায় অংশ নেওয়ার মতো কাজগুলো সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করে।

আমরা যদি নিজেদের জীবনে এই ছয়টি হক যথাযথভাবে পালন করি, তাহলে পারস্পরিক দূরত্ব কমবে এবং মুসলিম সমাজে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি আরও শক্তিশালী হবে।

উপসংহার

এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এগুলো শুধু মুখে জানলেই হবে না; বাস্তব জীবনেও পালন করার চেষ্টা করতে হবে।

আসুন, আমরা একে অপরকে সম্মান করি, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াই এবং ইসলামের সুন্দর শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে একে অপরের হক আদায় করার এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন