... রাজনীতি কি আসলেই নোংরা, নাকি আমরাই একে ব্যবসা বানিয়েছি?

রাজনীতি কি আসলেই নোংরা, নাকি আমরাই একে ব্যবসা বানিয়েছি?



​আজকের সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত—"রাজনীতি খুব নোংরা জিনিস, ভালো মানুষেরা এতে জড়ায় না।" চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রইংরুমের আড্ডা, সবখানেই রাজনীতিকে একটি নেতিবাচক শব্দ হিসেবে দেখা হয়। অনেকের ধারণা, সমাজের সবচেয়ে খারাপ বা সুবিধাবাদী লোকেরাই রাজনীতি করে এবং এটাকে তাদের রুটি-রুজির মাধ্যম বানিয়েছে।

​কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমরা আসলে মূল রোগটা না চিনে ভুল জায়গায় দোষ দিচ্ছি। রাজনীতি নিজে কখনো খারাপ নয়; বরং রাজনীতিকে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সমস্যাটা সেখানে।

​রাজনীতি কোনো পেশা বা ব্যবসা নয়

​সাধারণ মানুষের মনে এই ভুল ধারণাটা জন্মেছে কারণ তারা চারপাশের কিছু মানুষকে দেখছে যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে। কিন্তু আদি এবং আসল দর্শন অনুযায়ী, রাজনীতি কোনো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম বা ব্যবসা নয়। এটি হলো—জনকল্যাণ এবং সমাজ পরিবর্তনের সর্বোচ্চ নীতি।

​একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে কি না, হাসপাতালের চিকিৎসা কেমন হবে—এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে রাজনীতি থেকে। তাই রাজনীতি যদি বন্ধ হয়ে যায় বা সবাই যদি একে বর্জন করে, তবে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র স্থবির হয়ে পড়বে।

​খারাপ মানুষেরা কেন রাজনীতিতে আসছে?

​আজকে সমাজে যে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে আমাদের নিজেদেরও কিছুটা দায় আছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আড়াই হাজার বছর আগে একটি চিরন্তন সত্য কথা বলে গিয়েছিলেন:
​"রাজনীতিতে অংশ না নেওয়ার সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো, আপনার চেয়ে নিকৃষ্ট ও খারাপ কোনো ব্যক্তি আপনার ওপর শাসন করবে।"

​আমরা যখন রাজনীতিকে "নোংরা" বলে ভালো, শিক্ষিত এবং সৎ মানুষদের দূরে সরিয়ে রাখি, তখন সেই শূন্যস্থানটা পূরণ করে সমাজের সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী মহল। তারা রাজনীতিকে দেশসেবার মাধ্যম না বানিয়ে নিজেদের পকেট ভরার "রুটি-রুজি" বানিয়ে ফেলে। দোষটা তাই রাজনীতির নয়, দোষটা আমাদের নিষ্ক্রিয়তার।

​আদর্শ রাজনীতির মূল কথা: শাসন নয়, সেবা

​ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, যুগে যুগে মহৎ নেতারা মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিজের জীবন ও সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন। আদর্শ রাজনীতিতে নেতা কখনো জনগণের প্রভু নন, বরং তিনি হলেন জনগণের প্রধান সেবক।

​ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও নেতৃত্ব বা সমাজ পরিচালনাকে একটি বিশাল 'আমানত' এবং পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জনগণের অধিকার রক্ষা করাই শাসকের মূল কাজ। এই সর্বোচ্চ নীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থের নিচে চাপা পড়ে, তখনই রাজনীতি তার আসল সৌন্দর্য হারায়।

​পরিশেষ: দোষ কি ছুরির, নাকি ব্যবহারকারীর?

​রাজনীতিকে একটি ধারালো ছুরির সাথে তুলনা করা যায়। একজন দক্ষ সার্জন এই ছুরি দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচান, আবার একজন অপরাধী এটি দিয়ে মানুষের ক্ষতি করে। এখন ছুরিটি ভুল মানুষের হাতে পড়েছে বলে আমরা কি ছুরি ব্যবহার করাই নিষিদ্ধ করে দেব? নিশ্চয়ই না।

​ঠিক তেমনি, রাজনীতিকে গালি দিয়ে বা সমাজ থেকে একে মুছে ফেলার চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন চাইলে রাজনীতিকে পরিষ্কার করতে হবে। আর তার একমাত্র উপায় হলো—সৎ, শিক্ষিত এবং জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের রাজনীতিতে এগিয়ে আসা এবং সচেতন নাগরিকদের তাদের সমর্থন করা।
​রাজনীতি বদলালেই বদলে যাবে আমাদের সমাজ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন