বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই দল গঠনের প্রক্রিয়া এবং এতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা বিদ্যমান।
![]() |
| "বিএনপির সূচনালগ্নে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের মেলবন্ধনের একটি প্রতীকী দৃশ্য।" |
১. রণাঙ্গনের বীরদের হাত ধরে বিএনপির যাত্রা
বিএনপি গঠনের মূলে ছিলেন দুজন সামরিক কর্মকর্তা, যারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি রণাঙ্গনে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন:
* শহীদ জিয়াউর রহমান: কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী এবং 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক।
* কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ (বীর বিক্রম): জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ২৫শে মার্চ রাতে বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক।
এই দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার হাত ধরে যখন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এটি হবে নিখাদ একটি প্রো-লিবারেশন বা মুক্তিযুদ্ধপন্থী দল।
২. মুসলিম লীগ ও 'রাজাকার' বিতর্ক
বিএনপি গঠনের সময় জিয়াউর রহমান একটি "রেইনবো কোয়ালিশন" বা সব মতাদর্শের মানুষের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি তৎকালীন মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য ডানপন্থী দলগুলোর একটি বড় অংশকে বিএনপিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত।
ভিডিও বা ঐতিহাসিক আলোচনায় যে বিষয়টি বারবার উঠে আসে তা হলো—মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো:
* শাহ আজিজুর রহমান: ১৯৭১ সালে যিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন, তাকে জিয়াউর রহমান বিএনপির রাজনীতিতে আনেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করেন।
* মশিউর রহমান যাদু মিয়া: ভাসানী ন্যাপের এই নেতাকে জিয়াউর রহমান সিনিয়র মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) নিয়োগ দেন, যার বিরুদ্ধে দালাল আইনে অভিযোগ ছিল।
* আবদুর রহমান বিশ্বাস: মুসলিম লীগ ঘরানার এই নেতা পরবর্তীতে বিএনপির আমলে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, যার বিরুদ্ধেও একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্ক ছিল।
৩. কেন এই বিতর্কিত অন্তর্ভুক্তি?
প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জিয়াউর রহমান কেন স্বাধীনতাবিরোধী বা মুসলিম লীগ ঘরানার নেতাদের দলে টেনেছিলেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে কিছু কৌশল ছিল:
* আওয়ামী লীগ বিরোধী জোট: তৎকালীন শক্তিশালী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে একটি বড় ডানপন্থী ও রক্ষণশীল ভোটার ব্যাংক নিজের দিকে টানতে চেয়েছিলেন তিনি।
* জাতীয় সংহতির নামে রাজনৈতিক পুনর্বাসন: জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, সবাইকে রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে এলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল মূলত একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানোর একটি "সাজিশ" বা সুদূরপ্রসারী কৌশল।
Perfect for camping, hiking, or power outages — buy now and stay worry-free!
৪. বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ও উত্তরাধিকার
বিএনপি গঠনের সময় কর্নেল অলি আহমেদ পর্দার আড়ালে থেকে দল গুছানোর মূল দায়িত্ব পালন করেন। দলটিতে এমন এক ধরনের চেইন অফ কমান্ড তৈরি করা হয়েছিল যেখানে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে পুরনো মুসলিম লীগের রাজনীতিকদের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছিল। এই কাঠামোর কারণেই বিএনপি খুব দ্রুত একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে।
উপসংহার
বিএনপির উত্থানের ইতিহাস একই সাথে গৌরব এবং বিতর্কের সংমিশ্রণ। একদিকে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব, অন্যদিকে মুসলিম লীগ বা একাত্তরের বিতর্কিত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন করা—এই দুই সমান্তরাল ধারা বিএনপিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য কিন্তু বিতর্কিত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। আজকের রাজনীতিতে "বিএনপি ও মুসলিম লীগ" বা "রাজাকার পুনর্বাসন" নিয়ে যে বিতর্ক হয়, তার মূল প্রোথিত এই দল গঠনের সূচনালগ্নেই।
Tags:
রাজনীতি
